
শেখ হাসিনা গত ৫ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেন। ওই দিনই তার দেশত্যাগের কারণে নতুন সরকার গঠনের প্রক্রিয়াটি সামনে চলে আসে। এরই ধারাবাহিকতায় বৃহস্পতিবার (৮ আগস্ট) নোবেল লরিয়েট ড. মুহম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে ১৭ সদস্যের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করা হয়েছে। এরইমধ্যে প্রধান উপদেষ্টাসহ ১৪ জন উপদেষ্টা শপথ নিয়েছেন। বাকি তিন জন শিগগিরই শপথ নেবেন বলে আশা করা হচ্ছে। এই মুহূর্তে দেশে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা, দ্রুত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনা দূর করাসহ অনেক অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে নতুন সরকারকে। এ ক্ষেত্রে বৈদেশিক সমর্থন ও সহায়তার প্রয়োজন হবে। এমনটাই মনে করেন বিশেষজ্ঞ মহল।
কয়েকজন সাবেক কূটনীতিকের সঙ্গে আলাপকালে তারা জানান, ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা করা, দেশের ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধার, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বৈদেশিক সহায়তা প্রাপ্তি অব্যাহত রাখা, শান্তিরক্ষী মিশন যাতে ব্যাহত না হয়, সে জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়াসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সম্পর্কের সঙ্গে জড়িত বিষয়গুলো নিয়েও সরকারের সামনে রয়েছে চ্যালেঞ্জ। বিশেষজ্ঞদের মতে, বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে বৃহৎ শক্তিগুলোর মধ্যে সূক্ষ্ম ভারসাম্য বজায় রেখে পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা করা সরকারের জন্য এখন সবচেয়ে বেশি দরকার।
এ বিষয়ে সাবেক পররাষ্ট্র সচিব মো. শহীদুল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বাংলাদেশের জন্য সব দেশই গুরুত্বপূর্ণ। তবে এর মধ্যে ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন ও রাশিয়ার গুরুত্ব অন্য ধরনের।’
বাংলাদেশকে কেন্দ্র করে এসব দেশের জাতীয় স্বার্থ ভিন্ন এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ জানিয়ে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ সবসময় বিভিন্ন প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ শক্তির মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করে এসেছে। এখন সেটি করা আরও বেশি চ্যালেঞ্জিং।’
বিশ্বের বিভিন্ন শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক রাখার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ অর্থনীতিকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। কিন্তু ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক রাখার ক্ষেত্রে নিরাপত্তা ও প্রভাব বলয় বৃদ্ধিকে অগ্রাধিকার দিয়ে থাকে। অপরদিকে জাপান বাংলাদেশের কৌশলগত অংশীদার, ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন সাধারণভাবে যুক্তরাষ্ট্রের নীতি অনুসরণ করে থাকে। রাশিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক ১৯৭১ সাল থেকে। ফলে প্রতিটি দেশের সঙ্গে ভারসাম্য রেখে জাতীয় স্বার্থ অর্জন একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
ভাবমূর্তি রক্ষা করা
বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি, আইনের শাসন ও গণতন্ত্র নিয়ে পশ্চিমা বিশ্ব সবসময় সরব ছিল এবং আছে। আইনবহির্ভূত হত্যা, গুম, মানবপাচার, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অতিরিক্ত মাত্রায় শক্তি প্রয়োগ, গণতান্ত্রিক দুরবস্থা, রাজনৈতিক গ্রেফতার, মত প্রকাশ ও সমাবেশ করার স্বাধীনতাসহ বিভিন্ন কারণে বাংলাদেশের সামগ্রিক নাগরিক অধিকারের বিষয়টি প্রশ্নবিদ্ধ ছিল। গত তিন সপ্তাহে মানবাধিকার লঙ্ঘন সংক্রান্ত বিভিন্ন ঘটনাবলি বাংলাদেশের ভাবমূর্তি আরও ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। এতদিনের জমে থাকা মানবাধিকার লঙ্ঘন সংক্রান্ত ঘটনাবলির সুরাহা করার ক্ষেত্রে এখন একটি বড় সুযোগ।
শপথ গ্রহণ করছেন সরকারের উপদেষ্টারা, ছবি: সংগৃহীতএ বিষয়ে সাবেক রাষ্ট্রদূত মো. সুফিউর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আন্তর্জাতিক ফোরামে বিভিন্ন দেশ ও মানবাধিকার বিষয়ক সংস্থা তাদের পর্যবেক্ষণে মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে প্রকাশ্যে উদ্বেগ প্রকাশ করে থাকে। বাংলাদেশও এর জবাব দেওয়ার চেষ্টা করে।’
তিনি বলেন, ‘মানবাধিকার পরিস্থিতির উন্নয়নে বাংলাদেশ যে আন্তরিকভাবে চেষ্টা করছে—এটি বিশ্বাসযোগ্যভাবে বিশ্বের কাছে তুলে ধরতে হবে। এটি তখনই সম্ভব হবে, যখন অভ্যন্তরীণ নীতি ও প্রয়োগের মধ্যে সেটির প্রতিফলন থাকবে। বাংলাদেশে অনেক সংবাদপত্র বা টেলিভিশন চ্যানেল আছে। কিন্তু এতে প্রমাণ করে না যে বাংলাদেশের মিডিয়া স্বাধীনভাবে তাদের মত প্রকাশ করতে পারে।’
রাজনীতি ও অর্থনীতি
বাংলাদেশে এখন অর্থনৈতিক সংকট চলছে, বিশেষ করে বৈদেশিক মুদ্রা সংকট। এ পরিস্থিতিতে বৈদেশিক সহায়তা দরকার। কীভাবে কার কাছ থেকে সহজ শর্তে আর্থিক সহায়তা পাওয়া সম্ভব, সেটির ক্ষেত্রে পররাষ্ট্রনীতির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার সুযোগ আছে।
এ বিষয়ে শহীদুল হক বলেন, ‘আন্তর্জাতিক সম্পর্কে চ্যারিটি বলে কিছু নেই। প্রত্যেকের জাতীয় স্বার্থ আছে এবং এখানে উভয়পক্ষের জন্য লাভজনক একটি সমাধানে পৌঁছানোর চেষ্টা করা হয়।’
বৈশ্বিক রাজনীতি এবং অর্থনীতিকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই জানিয়ে তিনি বলেন, ‘বৃহৎ শক্তিগুলোর মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা আছে। একটি পক্ষের কাছ থেকে নেওয়া সুযোগ যাতে অন্যপক্ষের অসুবিধার কারণ না হয়—সেটি যথাযথ বিবেচনা করা দরকার।’
এ বিষয়ে সুফিউর রহমান বলেন, ‘ভারতের রাজনৈতিক প্রভাব এবং চীনের অর্থনৈতিক সক্ষমতার মধ্যে বাংলাদেশকে ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে।’
বাংলাদেশে তিস্তা প্রকল্প বাস্তবায়নে শুরু থেকেই চীন আগ্রহ প্রকাশ করে আসছে। কিন্তু তাদের প্রস্তাবনা উপেক্ষা করে সদ্য বিদায়ী সরকার সিদ্ধান্ত নেয়—তিস্তা প্রকল্প বাস্তবায়নে ভারতের সঙ্গে কাজ করবে। গোটা বিষয়টি চীন স্বাভাবিক নেয়নি বলে তিনি জানান।
সুফিউর রহমান আরও বলেন, ‘এ ধরনের রাজনৈতিক আগ্রহ এবং অর্থনৈতিক স্বার্থের মধ্যে সূক্ষ্ম ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে নতুন সরকারকে।’
তিনি বলেন, ‘একইসঙ্গে অন্যান্য সক্ষম দেশগুলোর কাছ থেকে অর্থনৈতিক সহায়তা ও সুযোগ সুরক্ষিত করাটা বাংলাদেশের জন্য জরুরি। এ জন্য দরকার সমমর্যাদাপূর্ণ বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপন। সর্বোপরি সবকিছুর ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারের প্রয়াসকে বিশেষভাবে অগ্রাধিকার দিতে হবে।’