
প্রিয়জন ডেস্কঃ বাংলাদেশের অর্থনীতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে থাকা ‘সোনালি আঁশ’ পাটের ভালো ফলনে রাজশাহীর কৃষকদের মধ্যে দেখা দিয়েছে স্বস্তি। অনুকূল আবহাওয়া, সময়মতো বৃষ্টি এবং কৃষকদের যথাযথ পরিচর্যায় চলতি মৌসুমে জেলায় পাটের আবাদ ও উৎপাদন বেড়েছে। একই সঙ্গে বাজারে সন্তোষজনক দাম পাওয়ায় লাভের আশায় বুক বাঁধছেন কৃষকরা। চলতি মৌসুমে রাজশাহীতে উৎপাদিত পাট বিক্রি করে প্রায় ৫৪৯ কোটি টাকা আয় হতে পারে বলে জানিয়েছে কৃষি বিভাগ।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, রাজশাহীর নয়টি উপজেলাতেই এবার কমবেশি পাটের আবাদ হয়েছে। মোট ১৮ হাজার ৩৯৯ হেক্টর জমিতে পাট চাষ করা হয়েছে। এসব জমি থেকে ৪৯ হাজার মেট্রিক টন পাট উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
গত ২০২৫ সালে জেলায় ১৭ হাজার ৩০৫ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়েছিল। সে বছর উৎপাদন হয়েছিল ৪৮ হাজার ৬৭৭ মেট্রিক টন। গত বছরের তুলনায় এবার আবাদি জমির পরিমাণ যেমন বেড়েছে, তেমনি উৎপাদনের পরিমাণও বাড়ার প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
চলতি মৌসুমে পাট কাটা, জাগ দেওয়া ও আঁশ ছাড়ানোর কার্যক্রম এখন শেষ পর্যায়ে। কৃষি বিভাগের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, ইতোমধ্যে মোট আবাদি জমির প্রায় ৮২ শতাংশের পাট কাটা শেষ হয়েছে। এসব জমি থেকে পাওয়া গেছে প্রায় ৪৮ হাজার ২০০ মেট্রিক টন পাট। অবশিষ্ট জমির পাট কাটা শেষ হলে উৎপাদন নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশা সংশ্লিষ্টদের।
এদিকে এবার পাটের বাজারদরও কৃষকদের জন্য বেশ আশাব্যঞ্জক। রাজশাহীর বিভিন্ন হাট-বাজারে বর্তমানে প্রতি মণ (৪০ কেজি) পাট ৪ হাজার থেকে ৪ হাজার ৩০০ টাকা পর্যন্ত দরে বিক্রি হচ্ছে। কৃষি বিভাগের হিসাবে, প্রত্যাশিত উৎপাদন ও বর্তমান বাজারদর বিবেচনায় চলতি মৌসুমে পাট বিক্রি করে প্রায় ৫৪৮ কোটি ৮২ লাখ টাকা আয় হতে পারে। বিপুল এই অর্থ গ্রামীণ অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাঘা উপজেলার মনিগ্রাম এলাকার পাটচাষি মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, গত বছর পাটের দাম তুলনামূলক কম থাকায় কৃষকদের মধ্যে হতাশা ছিল। তবে এবার পরিস্থিতি অনেক ভালো। ফলনও ভালো হয়েছে, পাশাপাশি বাজারে প্রতি মণ পাট ৪ হাজার টাকার বেশি দামে বিক্রি করতে পারছেন। এতে উৎপাদন খরচ বাদ দিয়েও ভালো লাভ হচ্ছে।
মোহনপুর উপজেলার কৃষক আব্দুল মতিন বলেন, এ বছর আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় পাট জাগ দেওয়া ও ধোয়ার কাজে বড় ধরনের সমস্যায় পড়তে হয়নি। মৌসুমের শুরুতে বৃষ্টির কিছুটা ঘাটতি থাকলেও পরে পর্যাপ্ত বৃষ্টি হওয়ায় পরিস্থিতি অনুকূলে আসে। বর্তমান বাজারদর ভালো থাকায় পরিবারের প্রয়োজনীয় খরচ মিটিয়ে কিছু অর্থ সঞ্চয় করা সম্ভব হবে বলে জানান তিনি।
রাজশাহীতে উৎপাদিত পাট শুধু স্থানীয় বাজারেই বিক্রি হচ্ছে না। জেলার চাহিদা পূরণের পাশাপাশি এসব পাট দেশের বিভিন্ন পাটজাত পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানে সরবরাহ করা হচ্ছে। পরে পাট প্রক্রিয়াজাত করে তৈরি বিভিন্ন পণ্য দেশের পাশাপাশি বিদেশের বাজারেও রপ্তানি করা হয়। ফলে রাজশাহীর পাট জাতীয় অর্থনীতিতেও অবদান রাখছে।
কৃষি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, উন্নত জাতের বীজ ও সারের সহজলভ্যতা, কৃষকদের প্রয়োজনীয় সহায়তা এবং পাটের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা গেলে আগামীতে রাজশাহীতে পাটের আবাদ আরও বাড়ানো সম্ভব। এতে কৃষকদের আয় ও লাভের পরিমাণও বাড়বে।
রাজশাহী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক (শস্য) মিতা সরকার বলেন, চলতি মৌসুমে জেলায় ১৮ হাজার ৩৯৯ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়েছে। এসব জমি থেকে ৪৯ হাজার মেট্রিক টন পাট উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। গত বছর ১৭ হাজার ৩০৫ হেক্টর জমিতে পাট আবাদ করে ৪৮ হাজার ৬৭৭ মেট্রিক টন উৎপাদন হয়েছিল।
তিনি বলেন, বর্তমানে প্রতি মণ পাট সর্বোচ্চ ৪ হাজার ৩০০ টাকা পর্যন্ত দরে বিক্রি হচ্ছে। এই দর অব্যাহত থাকলে চলতি মৌসুমে রাজশাহীতে পাট বিক্রি করে প্রায় ৫৪৯ কোটি টাকা আয় হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। উৎপাদিত পাট স্থানীয় চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন পাটজাত পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানে সরবরাহ করা হচ্ছে।