২২ বছর পর আওয়ামী লীগে নতুন প্রার্থী, বিদ্রোহের শঙ্কায় নেতারা

২২ বছর পর আওয়ামী লীগে নতুন প্রার্থী, বিদ্রোহের শঙ্কায় নেতারা

সিলেট সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে দলীয় প্রার্থী হিসেবে যুক্তরাজ্যপ্রবাসী মো. আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরীকে বেছে নিয়েছে আওয়ামী লীগ। প্রায় ২২ বছর পর এবার সিলেটে নতুন প্রার্থী পেল আওয়ামী লীগ। তবে এখন মনোনয়নবঞ্চিত ব্যক্তিদের ঐক্যবদ্ধভাবে নির্বাচনী মাঠে সক্রিয় রাখাই মূল চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন তৃণমূলের নেতা-কর্মীরা। কারণ, স্থানীয় নেতারা আগেই ঘোষণা দিয়েছেন, আনোয়ারুজ্জামান ছাড়া স্থানীয় যে কাউকে মনোনয়ন দিলে তাঁরা একসঙ্গে কাজ করবেন।

২০০২ সালে সিলেট পৌরসভাকে সিটি করপোরেশনে উন্নীত করা হয়। এই মহানগরের আয়তন ৭৯ দশমিক ৫০ বর্গকিলোমিটার, ওয়ার্ড ৪২টি। সিটি করপোরেশন হওয়ার পর এবার পঞ্চমবারের মতো নির্বাচন হতে যাচ্ছে। প্রথম চারবারই মেয়র পদে আওয়ামী লীগের হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন প্রয়াত বদরউদ্দিন আহমদ কামরান। ২০২০ সালে তিনি মারা গেলে তাঁর জায়গায় নতুন প্রার্থী খোঁজা শুরু হয়।

সিটি করপোরেশনে বর্তমান মেয়র বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য আরিফুল হক চৌধুরী। টানা দুই দফায় তিনি মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন। তবে বিএনপি দলীয়ভাবে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে না। এ অবস্থায় শেষ পর্যন্ত তিনি নির্বাচন করবেন কি না, তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি।

৩ এপ্রিল নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর আওয়ামী লীগের হয়ে মেয়র পদে ১১ জন ফরম সংগ্রহ করেন। আনোয়ারুজ্জামান ছাড়া অন্য ১০ জন হলেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ; মহানগর সহসভাপতি আসাদ উদ্দিন আহমদ, আবদুল খালিক; সাধারণ সম্পাদক মো. জাকির হোসেন; যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এ টি এম এ হাসান, আজাদুর রহমান; সাংগঠনিক সম্পাদক আরমান আহমদ শিপলু, ছালেহ আহমদ সেলিম; সদস্য প্রিন্স সদরুজ্জামান চৌধুরী ও ৭ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সদস্য মো. মাহি উদ্দিন আহমদ।

আজ শনিবার সকালে গণভবনে দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত স্থানীয় সরকার জনপ্রতিনিধি মনোনয়ন বোর্ডের সভায় মেয়র পদে প্রার্থী হিসেবে মো. আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরীকে চূড়ান্ত মনোনয়ন দেওয়া হয়। তিনিই এবার সিলেটে নৌকা প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করবেন।

এর আগে গত ২২ জানুয়ারি যুক্তরাজ্য থেকে দেশে ফিরে আনোয়ারুজ্জামান সিলেট সিটি নির্বাচনে মেয়র পদে প্রার্থিতা ঘোষণা করে প্রচার শুরু করেন। এ সময় তিনি বলেন, দলের উচ্চপর্যায় থেকে তাঁকে নির্বাচনের বিষয়ে ‘সবুজ সংকেত’ দেওয়া হয়েছে। এর আগে বিগত দুটি সংসদ নির্বাচনে আনোয়ারুজ্জামান সিলেট-২ (ওসমানীনগর–বিশ্বনাথ) আসনে দলীয় মনোনয়ন চেয়ে ব্যর্থ হয়েছিলেন।

আনোয়ারুজ্জামান ছাড়া অন্য ১০ জন হলেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ; মহানগর সহসভাপতি আসাদ উদ্দিন আহমদ, আবদুল খালিক; সাধারণ সম্পাদক মো. জাকির হোসেন; যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এ টি এম এ হাসান, আজাদুর রহমান; সাংগঠনিক সম্পাদক আরমান আহমদ শিপলু, ছালেহ আহমদ সেলিম; সদস্য প্রিন্স সদরুজ্জামান চৌধুরী ও ৭ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সদস্য মো. মাহি উদ্দিন আহমদ।

এ বিষয়ে কথা বলতে আনোয়ারুজ্জামানের মুঠোফোনে একাধিকবার চেষ্টা করেও তাঁকে পাওয়া যায়নি। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে এক স্ট্যাটাসে তিনি রাজনৈতিক সহকর্মী ও নগরবাসীর অকুণ্ঠ সহযোগিতা চেয়েছেন। তিনি সিলেট নগরের বাসিন্দাদের আগামী ২১ জুন নৌকা প্রতীকে ভোট দিয়ে তাঁকে জয়ী করার আহ্বান জানান।

আনোয়ারুজ্জামানের একটি ঘনিষ্ঠ সূত্র জানায়, তিনি এখন ঢাকায়। আগামীকাল রোববার তিনি টুঙ্গিপাড়ায় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কবর জিয়ারতে যাবেন। সোমবার তাঁর সিলেটে ফেরার কথা রয়েছে।

মনোনয়ন বঞ্চিত ব্যক্তিদের ঐক্যবদ্ধ করার চ্যালেঞ্জ

দলীয় নেতা-কর্মী ও সাধারণ ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বর্তমান মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে থাকলে এবারের নির্বাচন খুবই প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হতে পারে। এ অবস্থায় আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়নবঞ্চিত ব্যক্তিদের ঐক্যবদ্ধ করে নির্বাচনী মাঠে থাকাই হবে আনোয়ারুজ্জামানের বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ, মনোনয়নপ্রত্যাশী ব্যক্তিদের মধ্যে একাধিক ব্যক্তি বিভিন্ন সময় গণমাধ্যমে বলেছেন, দল থেকে যাঁকে মনোনয়ন দেওয়া হবে, তাঁর পক্ষেই তাঁরা কাজ করবেন। তবে সিলেটের তৃণমূলের রাজনীতিতে সক্রিয়, এমন কাউকে যাতে মনোনয়ন দেওয়া হয়। মহানগরের রাজনীতিতে সক্রিয় নন, এমন কেউ যেন মনোনয়ন না পান।

নির্বাচনে যাঁদের ভূমিকাকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হচ্ছে, তাঁদের অন্যতম মিসবাহ উদ্দিন। তিনি কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদকসহ জেলা পর্যায়ে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিলেন। সিলেটের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন সক্রিয় থাকায় তাঁর একটি সমর্থক গোষ্ঠী আছে। এ ছাড়া বাগ্মিতার কারণে সাধারণ ভোটারদের মধ্যেও তাঁর জনপ্রিয়তা আছে। এর আগে সিলেট-১ ও সিলেট-৩ সংসদীয় আসনে মনোনয়ন চেয়ে তিনি ব্যর্থ হন।

সবাই দলীয় সিদ্ধান্ত মেনে মো. আনোয়ারুজ্জামানকে সমর্থন দেবেন বলে জানিয়েছেন। তবে এই সমর্থনের ধরন বা মাত্রা কেমন হবে, তা আর কিছুদিন পর বোঝা যাবে বলে মন্তব্য করেছেন স্থানীয় একাধিক নেতা।

সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও বর্তমান সহসভাপতি আসাদ উদ্দিনও দ্বিতীয়বারের মতো মেয়র পদে দলীয় মনোনয়ন চেয়ে ব্যর্থ হয়েছেন। তাঁর বড় ভাই মাসুক উদ্দিন আহমদ সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের বর্তমান সভাপতি। আসাদ উদ্দিনেরও তৃণমূল ও দলীয় পর্যায়ে প্রভাব রয়েছে।

সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের বর্তমান সাধারণ সম্পাদক মো. জাকির হোসেনের সক্রিয় সমর্থনও নির্বাচনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ মনে করেছেন অনেকে। তাঁদের মতে, মহানগরের নেতা-কর্মীদের বড় একটি অংশ তাঁর একনিষ্ঠ সমর্থক।

অন্যদিকে সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আরমান আহমদেরও জনসমর্থন আছে। তিনি প্রয়াত মেয়র বদরউদ্দিন আহমদ কামরানের ছেলে। এ ছাড়া চারবারের কাউন্সিলর ও মহানগর আওয়ামী লীগের একজন প্রভাবশালী নেতা হিসেবে আজাদুর রহমানেরও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক কর্মী-সমর্থক আছে।

প্রভাবশালী এই পাঁচ নেতার মধ্যে আজাদুর ছাড়া প্রত্যেকের সঙ্গেই কথা বলেছে প্রথম আলো। তাঁরা সবাই দলীয় সিদ্ধান্ত মেনে মো. আনোয়ারুজ্জামানকে সমর্থন দেবেন বলে জানিয়েছেন। তবে এই সমর্থনের ধরন বা মাত্রা কেমন হবে, তা আর কিছুদিন পর বোঝা যাবে বলে মন্তব্য করেছেন স্থানীয় একাধিক নেতা।

‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী থাকতে পারে

এ পর্যন্ত বিএনপির হয়ে অথবা স্বতন্ত্র হিসেবে বর্তমান মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীর নির্বাচনে আসা চূড়ান্ত হয়নি। তিনি আগামীকাল যুক্তরাজ্য থেকে সিলেটে ফিরবেন। এরপর নির্বাচন নিয়ে তাঁর চূড়ান্ত অবস্থান জানা যাবে।

আওয়ামী লীগ ছাড়াও নির্বাচনের মাঠে আছে জাতীয় পার্টি ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। জাতীয় পার্টির সিলেট মহানগর কমিটির আহ্বায়ক নজরুল ইসলাম, বীর মুক্তিযুদ্ধা মাহবুবুর রহমান চৌধুরী ও যুক্তরাজ্য জাতীয় পার্টির সহসভাপতি আবদুস সমাদ প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চাইছেন। ইসলামী আন্দোলনের হয়ে মাঠে আছেন দলটির কেন্দ্রীয় কমিটির সিলেট বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মাহমুদুল হাসান।

স্থানীয় আওয়ামী লীগের একটি সূত্রে জানা গেছে, বর্তমান মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ালে আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশী ব্যক্তিদের মধ্যে এক বা একাধিক ব্যক্তি ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করতে পারেন।

তবে সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি মাসুক উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, আওয়ামী লীগ অনেক বড় দল। ফলে মনোনয়নপ্রত্যাশী ব্যক্তির সংখ্যা স্বাভাবিকভাবেই বেশি ছিল। তবে নেত্রীর সিদ্ধান্তের বাইরে যাওয়ার সুযোগ কারও নেই। তাই দল যাঁকে মনোনয়ন দিয়েছে, তাঁর পক্ষেই এককাট্টা হয়ে কাজ করে নৌকার বিজয় নিশ্চিত করতে হবে।

নির্বাচন কমিশনের তফসিল অনুযায়ী, ২১ জুন ইভিএমে সিলেট সিটি করপোরেশন নির্বাচন হবে। ২৩ মে পর্যন্ত মনোনয়নপত্র দাখিল করা যাবে। আর মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিন ১ জুন।

আনোয়ারুজ্জামানের সমর্থনে মিছিল

আনোয়ারুজ্জামানের দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়লে বেলা সোয়া তিনটার দিকে তাঁর সমর্থনে মিছিল করেন দলীয় নেতা-কর্মীরা। জেলা ও মহানগর যুবলীগ, ছাত্রলীগ ও মহানগর স্বেচ্ছাসেবক লীগের উদ্যোগে মিছিলটি হয়। সিলেট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের সামনে থেকে শুরু হয়ে জিন্দাবাজার হয়ে কোর্ট পয়েন্ট এলাকায় গিয়ে মিছিলটি শেষ হয়।

মিছিলে সহযোগী সংগঠনের শীর্ষস্থানীয় নেতারা উপস্থিত থাকলেও জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগের গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের দেখা যায়নি। কেবল মহানগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক বিধান কুমার সাহাকে মিছিলে দেখা গেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *