স্বজনদের এপারে অস্থিরতায় দিন কাটছে

স্বজনদের এপারে অস্থিরতায় দিন কাটছে

‘আমাদের বংশের কত মানুষ এখনও ওখানে রয়েছে। বুথিডাং-এ থাকা স্বজনদের হাহাকার ফোনে শুনেছি। গত শুক্র ও শনিবারের পর আর তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারিনি। অপেক্ষা করছি, কখন তারা কল করবেন, যদি বেঁচে থাকেন।’

‘‘আমার বাবার এক প্রতিবেশী গত সোমবার কল করে বলেছেন, ‘সব পুড়িয়ে দিয়েছে।’ তাদের খাবার নেই, থাকার জায়গা নেই। ওরা এখন আমাদের সঙ্গে এসে বাঁচতে চান।’’

কথাগুলো বলছিলেন কক্সবাজারের উখিয়ায় রোহিঙ্গা ক্যাম্পে থাকা অ্যাক্টিভিস্টরা। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, আরাকান আর্মির বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে যে, তাদের কারণে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের পশ্চিমাঞ্চলে নির্যাতিত হাজারো মানুষ নতুন করে বাস্তুচ্যুত হয়েছে। মাইলের পর মাইলজুড়ে ধ্বংসযজ্ঞ চলেছে। অপরদিকে রাখাইনে সহিংসতা বেড়ে যাওয়ায় উদ্বেগ জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশে আশ্রিত প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গা শঙ্কা আর অস্থিরতায় তিন কাটাচ্ছে।

এদিকে বুথিডাংয়ের বাসিন্দা এবং ফ্রি রোহিঙ্গা কোয়ালিশনের সহ-প্রতিষ্ঠাতা নে সান লুইনের বরাত দিয়ে সিএনএন বলেছে, তিনি জানিয়েছেন, মাত্র কয়েকটি ঘর হয়তো অক্ষত আছে। পুরো শহর জ্বলছে।

মিয়ানমারের পশ্চিমে আটকে পড়া রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর পরিবারগুলোর ওপর হামলা চলছে। অগ্নিসংযোগের হামলায় দুই লাখ লোক বাস্তুচ্যুত হওয়ার খবর প্রকাশের পর বাংলাদেশের ক্যাম্পে থাকা রোহিঙ্গারা প্রিয়জনদের সঙ্গে যোগাযোগ করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে। পরিস্থিতির ভয়াবহতায় মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের মুখপাত্র ম্যাথিউ মিলার বলেছেন, রাখাইন রাজ্যে সহিংসতার খবরে যুক্তরাষ্ট্র গভীরভাবে উদ্বিগ্ন এবং একইসঙ্গে সতর্ক করে বলেছেন ‘আরও নৃশংস ঘটনা ঘটার ঝুঁকি রয়েছে।’

এদিকে আরাকান আর্মি এটিকে কোনোভাবেই হামলা বলে স্বীকার করে না। তাদের মুখপাত্র খাইং থু খা গত শুক্রবার (১৭ মে) সন্ধ্যায় টেলিগ্রামে লিখেছেন, ‘বুথিডাংয়ের মুসলিম সম্প্রদায়গুলোকে সরিয়ে নিয়ে তাদের খাদ্য, আশ্রয় এবং চিকিৎসাসেবা প্রদান করা হয়েছে। শহরে কোনও অগ্নিসংযোগের কথা তারা স্বীকার করে না। ২০ মে এক বিবৃতিতে তারা (আরাকান আর্মি) বলেছে, ‘সামরিক আচরণবিধির অধীনে থেকে, লড়াইয়ের নীতি তারা মেনে চলে। তারা কখনও বেসামরিক বস্তুকে লক্ষ্য করে না।’ এমনকি তারা নতুন একটা শব্দ ‘বাঙালি সন্ত্রাসী’ বাজারে ছেড়ে দিয়েছে, যাদেরকে তারা এপারের (বাংলাদেশের) রোহিঙ্গা জঙ্গি হিসেবে চিহ্নিত করে। তাদের দাবি, তারাই বুথিডাং ধ্বংস করতে চায়।

যদিও বাংলাদেশে থাকা ওই এলাকায় বাস্তুচ্যুত মানুষের স্বজনেরা খোঁজ নিয়ে জানতে পেরেছে, রাখাইন রাজ্যে একটি মানবিক সংকট তৈরি হয়েছে। সেখানে নতুন বাস্তুচ্যুত বাসিন্দারা খাবার বা বিশুদ্ধ পানি পেতে অক্ষম। এমনকি তারা কোনোভাবে এপারে এসে জীবন বাঁচানোর কথাও বলছে।

ফ্রি রোহিঙ্গা কোয়ালিশনের ‘নে সান লুইন’ এর বরাত দিয়ে সিএনএন প্রতিনিধি বলছেন, বুথিডাংয়ের বেশ কয়েকজন বাসিন্দার সঙ্গে তিনি কথা বলতে পেরেছিলেন। ১৭ মে রাত সাড়ে ৯টার দিকে আরাকান আর্মির সৈন্যরা শহরে প্রবেশ করে এবং কিছুক্ষণ পরেই বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ শুরু করে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে যে, জান্তা বিমান হামলা এবং আর্টিলারি সেদিন বুথিডাং-এ আঘাত করেছিল।

নে সান লুইন এর বরাতে সিএনএন বলছে, লুইন জানিয়েছে— সেখানে মানবেতর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। কোনও এনজিও নেই, তাদের জন্য খাবার বিতরণ করবে কে, কেউ জানে না। মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী সব ধরনের প্রবেশাধিকার বন্ধ করে দিয়েছে।

উল্লেখ্য, ২০২৩ সালে চাহিদার তুলনায় ৩০১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার কম অর্থ সহায়তা দেওয়া হয়েছে। আর এই তহবিল কমার কারণে রোহিঙ্গাদের খাদ্য, রেশন কমানো হয়েছে— যা তাদের খাদ্য নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। ১৫ মে এক যৌথ বিবৃতিতে যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, নরওয়ে, সুইডেন ও সুইজারল্যান্ডের প্রতিনিধিরা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি রোহিঙ্গাদের জন্য সহায়তা বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন। তারা বলেন, গত বছর আন্তর্জাতিক সহায়তা কমেছে, এই ধারা অব্যাহত থাকলে রোহিঙ্গাদের জীবনে বিপর্যয় নেমে আসবে। সম্প্রতি রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শনের পর বুধবার (২২ মে) তারা এক যৌথ বিবৃতি দেন। সেখানে তারা আন্তর্জাতিক অভিবাসী সংস্থা আইওএম-এর চলতি বছরের জয়েন্ট রেসপন্স প্ল্যানকে সমর্থনের আহ্বান জানান। তারা মনে করেন, সবাই এগিয়ে না এলে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের খাদ্য, বাসস্থান ও সুরক্ষার সংকট তৈরি হবে।

মিয়ানমারের রাখাইনে সেনাবাহিনী ও বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মির মধ্যে লড়াইয়ের মুখে প্রাণে বাঁচতে গত ফেব্রুয়ারিতে রোহিঙ্গারা রাজ্যের নানা জায়গায় ছড়িয়ে পড়ছে। এই পরিস্থিতিতে দুই দেশের সীমান্ত এলাকায় আসা কয়েকশ রোহিঙ্গাকে মানবিক কারণে আশ্রয় দিতে বাংলাদেশকে অনুরোধ করেছিল জাতিসংঘ। কিন্তু বাংলাদেশ স্পষ্ট করেই সে সময় জানিয়ে দেয়— নতুন করে কোনও রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেওয়া সম্ভব নয়।

ওপারের যুদ্ধ পরিস্থিতি খারাপ উল্লেখ করে কক্সবাজার জেলার অতিরিক্ত শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মোহাম্মদ সামসুদ্দৌজা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আর কাউকে ঢুকতে না দেওয়ার সিদ্ধান্ত সীমান্তে আছে। আর ক্যাম্পে পুলিশ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। তারপরেও ওপারে নির্যাতনের শিকার রোহিঙ্গারা চুপি চুপি বাংলাদেশে ঢোকার চেষ্টা করছে না, সেটা বলা যাবে না।’