অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় পাঁচ সংস্কার কর্মসূচি নিচ্ছে সরকার

অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় পাঁচ সংস্কার কর্মসূচি নিচ্ছে সরকার

অর্থনৈতিক সংকট ও রিজার্ভ বাড়াতে মধ্যমেয়াদে (২০২৪-২৬) ৫টি খাতে বড় ধরনের সংস্কার কর্মসূচি নিচ্ছে অর্থ বিভাগ। যার রূপরেখা চূড়ান্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ব্যাংক ঋণের সুদ হারে করিডোর বা বাজারভিত্তিক চালু ও একক মুদ্রা বিনিময় হার বর্তমান পদ্ধতির পরিবর্তে বাজারের ওপর ছেড়ে দেওয়া।

এছাড়া অস্বাভাবিক ভর্তুকির অঙ্ক ও সরকারের ঋণব্যয় পর্যায়ক্রমে কমিয়ে আনা এবং সঞ্চয়পত্র থেকে কম ঋণ নেওয়া। পাশাপাশি আর্থিক খাতে সুশাসন নিশ্চিত করতে ব্যাংক কোম্পানি এবং ফাইন্যান্সিয়াল আইন সংশোধনের কথাও বলা হয়েছে। সংস্কার কর্মসূচির মধ্যে আগামীতে রাজস্ব আয় (বর্তমান পর্যায় থেকে ১.৭ শতাংশ) বাড়ানো এবং তিন মাস অন্তর জিডিপি (মোট দেশজ উৎপাদন) প্রবৃদ্ধির হার প্রকাশ করার বিষয়টি অন্তর্ভুক্তি করা হয়েছে। শিগগিরই এই সংস্কার কার্যক্রম শুরু হচ্ছে। তবে প্রতিটি সংস্কারই আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পরামর্শে করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে পাওয়া গেছে এসব তথ্য।

জানতে চাইলে অর্থনীতিবিদ এম কে মুজেরি যুগান্তরকে জানান, ডলারের মূল্য এখন অনেক বেশি। মুদ্রা বিনিময় হার বাজারভিত্তিক করা হলে ধারণা করা হচ্ছে ডলারের মূল্য কিছুটা বাড়তে পারে। এছাড়া ব্যাংক ঋণের সুদ হারে করিডোর চালু করা দরকার। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বাজারভিত্তিক সুদহার চালু করা যেতে পারে।

সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণ কমানো প্রসঙ্গে সাবেক অর্থসচিব মাহবুব আহমেদ যুগান্তরকে জানান, সঞ্চয়পত্র এক ধরনের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি হিসেবে কাজ করছে। অনেক মধ্যবিত্ত পরিবার সঞ্চয়পত্রের ওপর নির্ভরশীল। কারণ এখানে বিনিয়োগ করে মুনাফা বা সুদ অন্য ক্ষেত্র থেকে বেশি পাওয়া যায়। নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে অনেকে সঞ্চয়পত্র বেছে নিচ্ছেন। সরকার এ খাত থেকে ঋণ নেওয়া কমালে এর বিক্রি কমবে। এতে অনেকেই কিনতে পারবে না। এখানে খুব বেশি কড়াকড়ি না করাই ভালোই। জানা গেছে, চলতি মাসেই কেন্দ্রীয় ব্যাংক মুদ্রানীতি ঘোষণা করবে। সেখানে ব্যাংক ঋণের সুদহার এবং একক মুদ্রানীতি হার বাজারভিত্তিক চালুর ঘোষণা আসতে পারে। প্রসঙ্গত আইএমএফের শর্তে একই কথা হয়েছে। সংস্থাটি বাংলাদেশকে ঋণ দেওয়ার বিপরীতে ঋণের সুদহারে করিডোর চালু করতে বলেছে। পাশাপাশি মুদ্রা বিনিময় হার বাজারের ওপর ছেড়ে দিতে শর্ত দিয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা জানান, সুদ হারে করিডোর এমন একটি ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে সুদহারের বেঁধে দেওয়া সীমা ধীরে ধীরে তুলে নেওয়া হবে। তবে ব্যাংক ঋণের সুদের সর্বোচ্চ হার কত হবে, বাংলাদেশ ব্যাংক তা প্রতি মাসে নির্ধারণ করে ঘোষণা করবে। এ হার ঠিক করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক তার নির্ধারিত সূত্র অনুসরণ করবে। নতুন এ ব্যবস্থা কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা আগামী জুলাই থেকে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে। পাশাপাশি ভোক্তা ঋণে সর্বোচ্চ সুদহার কত হবে, তা-ও নির্ধারণ করে দেওয়া হবে।

প্রসঙ্গত, বর্তমান ব্যাংক ঋণের সুদ হারের ওপর কেন্দ্রীয় ব্যাংক ক্যাপ আরোপ করে রেখেছে।

যে কারণে আমানত ও ঋণের সুদ ৬-৯ শতাংশের মধ্যে বিরাজ করছে। অপরদিকে ডলারের মূল্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক ঠিক করে দিয়েছে।

সূত্র আরও জানায়, সংস্কারের আওতায় সরকারের ব্যয় ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে প্রথম কাজ হবে ভর্তুকি ব্যয় কমিয়ে আনা বা যৌক্তিকরণ। টাকার অবমূল্যায়ন ও বিশ্ব বাজারে মূল্যবৃদ্ধির কারণে বিদ্যুৎ, সার, প্রাকৃতিক গ্যাস ও জ্বালানি তেলে সরকারের অস্বাভাবিক ভর্তুকি ব্যয় বেড়েছে। এ ব্যয় সরকারের দায়কে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। প্রস্তাবিত (২০২৩-২৪) বাজেটে ভর্তুকিতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৬৬ হাজার ৭৬২ কোটি টাকা। সংশোধিত বাজেটে এ খাতে ৫০ হাজার ৯২৬ কোটি টাকা বরাদ্দ আছে। ভর্তুকি ব্যয় কমানো প্রসঙ্গে অর্থ বিভাগ সংস্কার কর্মসূচির প্রতিবেদনে বলেছে, বিশ্ববাজারের দামের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখা এবং ভর্তুকির পরিমাণ কমানোর লক্ষ্যে গত আগষ্টে পেট্রোলিয়াম পণ্যের মূল্য বাড়ানো হয়। এর ধারাবাহিকতায় একটি ফর্মুলাভিত্তিক নতুন পদ্ধতি চালু করা হবে। যা পেট্রোলিয়াম পণ্যের ভর্তুকির প্রয়োজনীয়তা দূর করবে।

ভর্তুকি কমানো ছাড়াও সংস্কার কর্মসূচিতে সরকারি ঋণ ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন, সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণ কম নেওয়া, নগদ ব্যবস্থাপনার উন্নয়নের লক্ষ্যে ট্রেজারির সঙ্গে অ্যাকাউন্ট আওতা বৃদ্ধি এবং ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার (ইএফটি) ব্যবহার বাড়ানো অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

মধ্যমেয়াদি এই সংস্কার কর্মসূচির পরিকল্পনায় প্রস্তাবিত বাজেটে মোট রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয় ৫ লাখ কোটি টাকা। পর্যায়ক্রমে ২০২৪-২৫ এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৫ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা এবং ৯ লাখ ৯ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। সেখানে বলা হয়, মধ্যমেয়াদে সরকার সতর্ক রাজস্বনীতি অনুসরণ করবে। এর মধ্যে বাজেটের ঘাটতির পরিমাণ জিডিপির ৩ দশমিক ৩ শতাংশের মধ্যে রাখা হবে। যা প্রস্তাবিত বাজেটে আছে জিডিপির ৫ দশমিক ২ শতাংশ। সেখানে আরও বলা হয়, এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে করনীতি এবং রাজস্ব প্রশাসনের সংস্কার করা হবে।

অর্থ বিভাগ সংস্কার কর্মসূচি প্রসঙ্গে বলেছে, বৈশ্বিক ও জাতীয় অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা শক্তিশালী এবং দীর্ঘমেয়াদে প্রবৃদ্ধি বজায় রাখা দরকার। এ উদ্দেশ্যে মধ্যে মেয়াদে বেশ কিছু সংস্কার কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *