রাজশাহীতে বাড়ছে ডায়রিয়া রোগীর সংখ্যা

রাজশাহীতে বাড়ছে ডায়রিয়া রোগীর সংখ্যা

রাজশাহীতে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। গত এক মাসে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে ১ হাজার ৬৩৫ জন ডায়রিয়া রোগী ভর্তি হয়েছে।

রামেক হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে ধীরে ধীরে ডায়রিয়া রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। এখন ডায়রিয়ায় আক্রান্ত রোগীরা শয্যা পাচ্ছে না। ওয়ার্ডের ভেতরে মেঝেতেও তাদের থাকতে দেওয়া হচ্ছে না। ডায়রিয়া রোগীদের থাকার স্থান হচ্ছে ওয়ার্ডের বাইরে একেবারে মানুষের চলাচলের রাস্তায়। সেখানে বৈদ্যুতিক পাখা না থাকার কারণে গরমে নাজেহাল হচ্ছে রোগীরা। এসব রোগীর ভরসা হাতপাখা। গত ১ মার্চ রামেকে ২২ জন ডায়রিয়া রোগী ভর্তি হয়। এরপর ৬ তারিখ পর্যন্ত যথাক্রমে ২৭, ২৮, ২৬, ২০ ও ২৬ জন রোগী ভর্তি হয়। ৭ মার্চ ভর্তি হওয়া রোগীর সংখ্যা বেড়ে ৩৮ জন হয়। এরপর ১৬ মার্চ পর্যন্ত যথাক্রমে ৩১,৩৯, ৩৮,৩৪, ৩০,৪০, ৪৩,৪৮ ও ৪৫ জন করে রোগী ভর্তি হয়। ১৭ মার্চ এক দিনে ডায়রিয়া রোগী ভর্তি ৫০ জন ছাড়ায়। ১৭ ও ১৮ মার্চ ভর্তি হয় ৫২ জন করে রোগী। ১৯ থেকে ২৪ মার্চ পর্যন্ত প্রতিদিন যথাক্রমে ৫৮, ৬২, ৫৯, ৭২, ৮০ ও ৮২ জন ভর্তি হয়। ২৫ মার্চ রোগী বেড়ে হয় ৯০ জন। এরপর ২৬ থেকে ৩১ মার্চ পর্যন্ত রোজ ভর্তি হয় যথাক্রমে ৮৮, ৯৯, ৭৪, ৯৩, ৬১ ও ৭৮ জন। গোটা মার্চ মাসে রামেক হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা হয় ১ হাজার ৬৩৫। গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে ১৫ নম্বর ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা যায়, ডায়রিয়ায় আক্রান্ত এক রোগীর মায়ের সঙ্গে হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতাকর্মীর বাগ্‌বিতণ্ডা চলছে। ওই রোগীর মা ওয়ার্ডের ভেতরে মেঝেতে বিছানা পাতায় এই বাগ্‌বিতণ্ডা। পরিচ্ছন্নতাকর্মী কোনোভাবেই ওয়ার্ডের ভেতরে ডায়রিয়া রোগী রাখতে দেবেন না।হাসপাতালের দায়িত্বরত একজন নার্স এসে ওই রোগীর মাকে বলেন, ‘হাসপাতালে রোগীর চিকিৎসা করতে হবে না। আপনি রোগী বাড়ি নিয়ে চলে যান।’ ওই পরিচ্ছন্নতাকর্মী বললেন, ‘জায়গা নষ্ট হলে কি আপনি পরিষ্কার করবেন? আমাকেই করতে হবে।’ শেষ পর্যন্ত ওই রোগীকে বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়। নগরীর কাঁঠালবাড়িয়া এলাকার আঁখি খাতুন (১৮) নামের এক রোগীর দাদি হাজেরা খাতুন বলেন, ‘ডায়রিয়ার কারণে গত বুধবার দুপুরে তিনি আঁখিকে ভর্তি করান। গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল পর্যন্ত চারটি স্যালাইন দেওয়া হয়েছে। তারপর রোগী একটু ভালো হয়েছে।’

১০ নম্বর ওয়ার্ডের বারান্দায় সাড়ে তিন বছরের শিশু আলিফকে নিয়ে বসে ছিলেন নগরীর ছোট বনগ্রাম এলাকার হাসি খাতুন। তিনি বলেন, ‘পানির মতো শুধু নেমে যাচ্ছে। ছোট বাচ্চাটা কাহিল হয়ে পড়েছে। ২৪ ঘণ্টায় পাঁচটা স্যালাইন দেওয়া হয়েছে। তা-ও কমেনি। স্যালাইনের স্ট্যান্ড ধরেই একটু পর পর বাথরুমে নিয়ে যেতে হচ্ছে।’ র‍্যাব-৫-এর অফিসের কর্মচারী মাসুদ রানা ভর্তি ছিলেন হাসপাতালের ১৪ নম্বর ওয়ার্ডে। বারান্দায় শুয়ে তিনি বলেন, ‘দুদিন আগে বাইরে শুধু এক বাটি চটপটি খেয়েছিলাম। তারপর থেকেই শুরু হয়েছে। গতকাল এক দিনে ১৫-২০ বার বাথরুমে গেছি। আজ সকাল থেকে ৭-৮ বার হয়ে গেছে। আরাম পাচ্ছি না।’

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সায়েন্স বিভাগের শিক্ষার্থী দুলাল হোসেনও শুয়ে ছিলেন একই বারান্দায়। তিনি বলেন, ‘একটু পর পর পাতলা পায়খানার পাশাপাশি বমিও হচ্ছে। ভোররাতে ভর্তির পর থেকেই স্যালাইন চলছে। এখানে ফ্যান থাকায় সমস্যা হচ্ছে। বন্ধুরা হাতপাখায় বাতাস করছে।’ এ বিষয়ে রামেক হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের চিকিৎসক মাহাবুবুর রহমান বাদশা বলেন, ‘শীত থেকে আবহাওয়া পরিবর্তন হয়ে গরম এসেছে। এখন গরম যত বাড়ছে, ডায়রিয়া রোগীও তত বাড়ছে। তৃষ্ণা মেটাতে মানুষ বাইরের বিভিন্ন ধরনের পানীয় কিংবা শরবত খাচ্ছে। এর ফলে তারা পানিবাহিত এই ডায়রিয়া রোগে আক্রান্ত হচ্ছে।’হাসপাতাল পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শামীম ইয়াজদানী বলেন, ‘মার্চের মাঝামাঝি থেকে রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। মাঝে একটু কম ছিল। এখন রোগী আরও বাড়বে নাকি কমবে, তা বলা যাচ্ছে না। তবে চিকিৎসার জন্য আমারা প্রস্তুত আছি।’