যা চলছে বেইলি রোডের ভবনটি ঘিরে

রাজধানীর বেইলি রোডে ‘গ্রিন কোজি কটেজ’ নামে সাততলা ভবনটি একদিন আগেও ছিল আলো ঝলমলে। নানা ধরনের দোকানে ছিল ক্রেতা সমাগম। বৃহস্পতিবার (২৯ ফেব্রুয়ারি) রাতে অগ্নিকাণ্ডে ভবনের পুরো চিত্র পাল্টে গেছে। ভবনটি এখন পরিণত হয়েছে ধ্বংসস্তূপে, সামনে পড়ে আছে ভাঙা কাঁচ, আগুনে পোড়া কয়লা। ভবনটি ঘিরে এখন শুধু হাহাকার আর নীরবতা।

শনিবার (২ মার্চ) সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত ওই ভবনের সামনে অবস্থান করে দেখা গেছে, নিরাপত্তার স্বার্থে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ভবনটি ঘিরে রেখেছে। ভবনের সামনে এখনও উৎসুক জনতার ভিড়। আজও ভবন পরিদর্শন করেছেন বিভিন্ন সংস্থার লোকজন। এছাড়া মারা যাওয়া ব্যক্তিদের স্বজন, বন্ধুরা তাদের শেষ স্মৃতি নিয়ে কথা বলছেন ভবনের সামনে এসে। খোলা হয়েছে ভবনটির আশপাশের ব্যবসা-প্রতিষ্ঠানও। ঘটনার পর এলাকার লোকজনের মাঝে ভয়ভীতিও তৈরি হয়েছে বলে জানান অনেকে।

‘গ্রিন কোজি কটেজ’ ভবনের সামনে এখনও উৎসুক জনতার ভিড়। ছবি: প্রতিবেদক

ইংলিশ মিডিয়ামে পড়তেন তিন বন্ধু সাইফ আলী ওয়াজেদ, ফয়সাল রেজা রাতুল ও বিয়ানকা রয়। বৃহস্পতিবার রাতে ভবনটির দ্বিতীয় তলায় একটি রেস্টুরেন্টে বিয়ানকা রয় মাকে নিয়ে খেতে গিয়েছিলে। নিচে আগুন লাগলে দ্বিতীয় তলা থেকে নামতে গিয়ে সিঁড়িতে আটকা পড়েন তারা। সেখানেই ধোঁয়ায় অচেতন হয়ে মারা যান।

ফয়সাল রেজা রাতুল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা একসঙ্গে পড়তাম। আমার বন্ধু তার মাকে নিয়ে এখানে রাতে খেতে এসেছিল। আগুন লাগলে তারা নিচ পর্যন্ত আসতে পারেনি। সিঁড়িতে আটকা পড়ে মারা যায়। তাদের মরদেহ আজ সিলেটের হবিগঞ্জে গ্রামের বাড়িতে পাঠানো হয়েছে।’

ভবনটির সামনে রয়েছে ‘মি. বেকার’ নামে একটি দোকান। এক পাশের শার্টার খুলে দোকানটিতে বেচাকেনা করা হচ্ছে। দোকানের পরিচালক কাজী নাবিল বলেন, ‘ঘটনা ঘটার পর আমরা সচেতন হই, এর আগে না। আমাদের সামনের ভবনে এমন একটি ঘটনা ঘটলো। এসব দেখে নিজের মধ্যে ভয় কাজ করে।’

এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার খ. মহিদ উদ্দিন বলেন, ‘ভবনের নিচতলার খাবার দোকান থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়। আগুনের ঘটনায় অবহেলাজনিত কারণে মৃত্যু অভিযোগে একটি মামলা করেছে পুলিশ। ভুক্তভোগী পরিবারের কেউ মামলা করতে চাইলেও করতে পারবে। এই ঘটনায় ইতোমধ্যে তিন জনকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। ভবনের মালিক থেকে শুরু করে যার দায় পাওয়া যাবে, তার বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

আজও ভবন পরিদর্শন করেছেন বিভিন্ন সংস্থার লোকজন। ছবি: প্রতিবেদক

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ভবনের প্রথম তলায় ‘চায়ে চুমুক’ নামে একটি রেস্টুরেন্ট ছিল। এছাড়া ছিল ‘গ্যাজেট অ্যান্ড গিয়ার’, ‘স্যামসাং’, ‘শেখ হোলিক ও ওয়াফে বে’ নামে চারটি শোরুম। দ্বিতীয় তলার পুরোটাজুড়ে ছিল ‘কাচ্চি ভাই’ রেস্টুরেন্ট। তৃতীয় তলায় ‘ইলিয়ন’ নামের একটি শোরুম। চতুর্থ তলায় ‘খানা’স’ নামে একটি রেস্টুরেন্ট, পঞ্চম তলায় ‘পিৎজা হাট’, ষষ্ঠ তলায় ‘স্টিট ওভেন’ ও ‘জেস্টি’ নামে দুটি রেস্টুরেন্ট এবং সপ্তম তলায় ‘ফোকুস’ ও ‘হাক্কা ডাকা’ নামে দুটি রেস্টুরেন্ট ছিল। এছাড়া ভবনটির ছাদেও ‘অ্যাম্বোশিয়া’ নামে একটি রেস্টুরেন্ট ছিল।

বৃহস্পতিবার (২৯ ফেব্রুয়ারি) রাতে আগুনের ঘটনায় এখন পর্যন্ত ৪৬ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছেন। মৃতদের মধ্যে ২০ জন পুরুষ, ১৮ জন নারী এবং আট জন শিশু‌। নিহতদের মধ্যে ৪০ জনের পরিচয় শনাক্ত করা গেছে। তাদের ৩৮ জনের মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। মর্গে রয়েছে দুজনের লাশ। ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে বাকি ছয় জনের পরিচয় জানার চেষ্টা চলছে।