বাংলাদেশ প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়ছে, পিছিয়ে থাকতে চায় না

বাংলাদেশ প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়ছে, পিছিয়ে থাকতে চায় না

অস্ত্র নিয়ে প্রথাগত যুদ্ধের পাশাপাশি আরও নানা রকম অপ্রথাগত যুদ্ধ চলছে বিশ্বব্যাপী। এর মধ্যে সাইবার যুদ্ধ রয়েছে, সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ রয়েছে। এসব ঝুঁকি মোকাবিলা করার জন্য বিভিন্ন দেশের সঙ্গে নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা করছে বাংলাদেশ। এরইমধ্যে ১০টি দেশের সঙ্গে ২৭টি প্রতিরক্ষা চুক্তি নিয়ে আলোচনা চলছে। একদিকে যেমন আধুনিক বাহিনী গড়ে তোলায় সহায়তা আকর্ষণের কাজ চলছে, অন্যদিকে সক্ষমতায়ও পিছিয়ে পড়তে চায় না বাংলাদেশ।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমাদের সক্ষমতা বাড়ছে। আমাদের ফোর্সেস গোল ২০৩০ আছে এবং সেটির আলোকে আমরা আমাদের বাহিনীকে ত্রিমাত্রিক রূপ দেওয়ার জন্য কাজ করছি।’

সীমিত সম্পদের মধ্যে থেকেও অভীষ্ট লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা আধুনিক বাহিনী গড়ে তুলছি।…এছাড়া অন্য ধরনের যুদ্ধ আছে। যেমন সাইবার যুদ্ধসহ বিভিন্ন কিছু। আমরা অবশ্যই পিছিয়ে থাকতে চাইবো না। সেটির জন্য বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সহযোগিতা থাকতে হবে। আমরা পিছিয়ে থাকতে চাই না। আমরা আধুনিক থাকতে চাই’, যুক্ত করেন তিনি।

বাংলাদেশের সক্ষমতা বাড়ছে

বাংলাদেশের অর্থনীতি দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে দেশটির প্রতি আকর্ষণ বাড়ছে বিভিন্ন দেশের।

পররাষ্ট্র সচিব বলেন, ‘একসময় আমাদের দারিদ্র্যপীড়িত দেশ হিসেবে চিহ্নিত করা হতো। অর্থাৎ দেশ চরম দরিদ্র অবস্থায় ছিল, এখন আর সেটি নেই। এখন আমাদের সবাই ভিন্ন চোখে দেখছে। আমাদের উচিত হবে এর সুযোগ নেওয়া। পরিশেষে এর মাধ্যমে আমরা লাভবান হবো।’

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাজ হচ্ছে চোখ-কান খোলা রাখা এবং কোথায় সুযোগ আছে সেটি খুঁজে বের করে যোগাযোগ করিয়ে দেওয়া। আমরা আর্মড ফোর্সেস ডিভিশনের সঙ্গে সবসময় কাজ করছি। এখানে একটি ডিফেন্স অনুবিভাগ খোলা উচিত বলে আমি মনে করছি, তিনি জানান।

বিভিন্ন দেশের সঙ্গে যোগাযোগ

বিদেশিদের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক প্রথাগত, অর্থাৎ দাতা-গ্রহীতার। সেখান থেকে বের হয়ে এসে সামগ্রিক অংশীদারিত্ব নিয়ে এখন আলোচনা করা হচ্ছে। এর মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতাও রয়েছে।

পররাষ্ট্র সচিব বলেন, ‘জাপান, ইউরোপিয়ান দেশগুলো এবং প্রথাগতভাবে যাদের সঙ্গে সম্পর্ক আছে, যেমন- রাশিয়া, চীন, ভারতের সঙ্গে আমরা থাকতে চাই। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দুটি চুক্তি নিয়ে আলোচনা চলছে।’

আমরা কোনও বিচ্ছিন্ন নীতি অনুসরণ করছি না। আমাদের বিভিন্ন সামরিক কলেজ আছে এবং সেখানে অনেক বিদেশি বাহিনীর সদস্যরা পড়তে আসেন। আমরা বিভিন্ন দেশের সঙ্গে যৌথ মহড়া করছি। আমাদের প্রতিরক্ষা বাহিনীর যে থিংকট্যাংকগুলো আছে, তারা বিদেশিদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন, জানান তিনি।

সচিব বলেন, ‘আমাদের নিরাপত্তা জোটের প্রতি আগ্রহ কম আছে। আমরা মোটামুটি নিরপেক্ষ থাকতে চাই। তার মানে এই নয় যে আমরা পিছিয়ে থাকবো। আমাদের এখানে যদি কিছু হয়, তখন আমরা যাতে পদক্ষেপ নিতে পারি।’

ইন্দো-প্যাসিফিক নিয়ে অনেক ধরনের জল্পনা-কল্পনা ছিল। তখন আমরা সেটিকে বন্ধ করতে চেয়েছি এবং সবাইকে দেখিয়েছি যে আমাদের স্বার্থ কোথায়। আমরা নিরাপদ যাতায়াত, জলদস্যুতামুক্ত সমুদ্র এবং সুনীল অর্থনীতির বিষয়গুলোতে জোর দিচ্ছি ।

প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ক্রয়

সব দেশ প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম কিনে থাকে। বাংলাদেশের কেনাকাটাও প্রথাগতভাবে কয়েকটি দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল।

পররাষ্ট্র সচিব বলেন, ‘একসময় সোভিয়েত ইউনিয়ন ছিল এবং পরে চীন আমাদের সরবরাহ করতো। কিন্তু এখন আমাদের চেষ্টা হচ্ছে উৎসকে বহুমুখীকরণ করা। এর বহুমুখীকরণের মধ্যে বড় একটি ভূমিকা রাখছে তুরস্ক। তাদের ন্যাটো-গ্রেড সরঞ্জাম আছে এবং সেটি শর্তযুক্ত ক্রয় নয়। এছাড়া দামও সুলভ।’

অন্যদিকে আমরা যদি জাপানের দিকে তাকাই তাহলে দেখবো তারা আগে কোনও প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম রফতানি করতে পারতো না। এখন তারা তাদের নীতি পরিবর্তন করেছে এবং তারাও এখন প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে অংশগ্রহণ করতে পারে। তারাও বাংলাদেশকে চিহ্নিত করেছে একটি সম্ভাব্য ক্রেতা হিসেবে। তারা নতুন চালু করা অফিসিয়াল সিকিউরিটি অ্যাসিসট্যান্সের অধীনে চারটি দেশকে সহায়তা দিচ্ছে এবং এর একটি বাংলাদেশ। এটি নিয়ে কাজ চলছে। এটি আমাদের জন্য নতুন সুযোগ, তিনি উল্লেখ করেন।

মোমেন বলেন, ‘ইউরোপে দাম কিছুটা বেশি। কিন্তু পণ্যের গুণগতমান ভালো। ফ্রান্সের রাডার সিস্টেম বা ইতালির হেলিকপ্টারের মান অনেক ভালো। ইতালির আগাস্টা হেলিকপ্টার যুক্তরাষ্ট্রেও ব্যবহার করা হয়। তাদের সাবমেরিনও আছে। ইউরোপেও কিছু পকেট আছে এবং আমাদেরও আগ্রহ আছে।’

ভবিষ্যৎকে মাথায় রেখে আমরা অনেক দেশের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক করতে চাই। সামনে কী কী ঝুঁকি আছে সেটি আমরা বিবেচনা করছি। তবে এর মানে এই না যে এই ঝুঁকি হচ্ছে যুদ্ধ। এটি সাইবার ঝুঁকি হতে পারে, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি হতে পারে। এটি খাদ্য নিরাপত্তা, মানবপাচার বা মহামারির ঝুঁকি হতে পারে। এছাড়া সন্ত্রাসবাদ তো আছেই। এসব কৌশলগত সম্পর্কের মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আছে, জানান তিনি।