আহমদিয়া জলসা নিয়ে বিরোধ, পঞ্চগড় শহরজুড়ে থমথমে অবস্থা

আহমদিয়া জলসা নিয়ে বিরোধ, পঞ্চগড় শহরজুড়ে থমথমে অবস্থা

আহমদিয়া সম্প্রদায়ের জলসা নিয়ে বিরোধের জেরে দুজনের মৃত্যুর ঘটনায় পঞ্চগড়ে থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। শহরজুড়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। আহমদিয়াদের জলসা বন্ধের দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল করা নিয়ে শুক্রবার মুসল্লি ও পুলিশের সংঘর্ষে আরিফুজ্জামান আরিফ (২৭) এবং জাহিদ হাসানসহ (২২) অর্ধশত ব্যক্তি আহত হন। বিকালে হাসপাতালে নেওয়ার পথে আরিফ মারা যান। আর গভীর রাতে করোতোয়া নদীর পার থেকে জাহিদের লাশ উদ্ধার করা হয়।

শনিবার বিকালে জলসা মাঠে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে আহমদিয়া মুসলিম জামাতের বহিঃসম্পর্ক, গণসংযোগ ও প্রেস বিভাগের প্রধান আহমদ তবশির চৌধুরী বলেন, বাদ জুমা জলসা শুরু হলে হামলা শুরু হয়। প্রথম ৩ ঘণ্টা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কোনো সহায়তা পাইনি। দুষ্কৃতকারীরা আমাদের এক তরুণকে হত্যা করেছে। ৭০ জনকে আহত করেছে। বারবার পুলিশ ও প্রশাসনকে জানানো হলেও তারা নিষ্ক্রিয় ছিল। তিনি আরও বলেন, পুরো আহমদিয় সম্প্রদায় নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। জলসা স্থগিত করার পরও অনেক বাড়িতে অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট চালানো হয়েছে। এ ঘটনার জন্য তিনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিষ্ক্রিয়তাকে দায়ী করেন।

এ ব্যাপারে খতমে নবুওয়ত পরিষদ ও ইসলামী আন্দোলন পঞ্চগড় জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক ক্বারী মোহাম্মদ আবদুল্লাহ বলেন, শুক্রবার আমাদের কোনো কর্মসূচি ছিল না। পঞ্চগড় থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল লতিফ মিঞা জানান, এ ঘটনায় মামলা প্রক্রিয়াধীন। ১২ জনকে আটক করা হয়েছে। পুলিশ সুপার এসএম সিরাজুল হুদা দাবি করেন পরিস্থিতি এখন স্বাভাবিক। পুলিশ, বিজিবি ও র‌্যাবের টহল জোরদার করা হয়েছে। জেলা প্রশাসক জহুরুল ইসলাম জানান, জলসা স্থগিতের পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়েছে।

‘নামাজ পড়ে এসেই খাব মা’ : শনিবার ইসলামবাগের ভাড়া বাসায় আরিফের মা আলেয়া বেগম বলেন, শুক্রবার সকালে বাসা থেকে বের হওয়ার সময় আরিফ বলেছিল, ‘মা আমার জন্য গরুর গোশত রান্না করিও। নামাজ পড়ে এসে খাব।’ আলেয়া বেগম আরও বলেন, বাপ-ছেলে একসঙ্গে নামাজে গেল। কিন্তু আমার ছেলেটা আর ফিরে এলো না। নামাজের পর শুনি আরিফ গুলিবিদ্ধ হয়েছে। এরপর খবর এলো আরিফ মারা গেছে। তিনি বারবার বলছিলেন, ‘একটামাত্র ছেলে আমার। ওকে নিয়ে কত স্বপ্ন ছিল। সব শেষ হয়ে গেল।’ দুই ভাইবোনের মধ্যে আরিফ ছিল ছোট। চাঁদপুর জেলায় বড় বোন ফরিদা ইয়াসমিনের বিয়ে হয়েছে। খবর পেয়ে তিনি এসেছেন। তিনি বলেন, আমার ভাই তো কোনো রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিল না। এখন মা-বাবার কি হবে?

পঞ্চগড় শহরের মসজিদপাড়া এলাকার বাসিন্দা আরিফরা কয়েক মাস ধরে ইসলামবাগ এলাকায় ভাড়া থাকছেন। আরিফের বাবা ফরমান আলী পুরোনো কাপড়ের দোকানের কর্মচারী। মা আলেয়া বেগম বাড়িতে সেলাইয়ের কাজ করেন। ঢাকায় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে কৃষি বিষয়ে ডিপ্লোমা শেষ করে আরিফ চাকরির চেষ্টা করছিলেন। সংসারের অভাব ঘোচাতে স্বল্প বেতনে শহরের একটি ছাপাখানায় (প্রিন্টিং প্রেসে) তিনি কাজ করতেন।

একমাত্র কর্মক্ষম ছেলেকে হারিয়ে শোকে বিহ্বল জাহিদের মা : ‘বিটা কইছিল, মারে আমি ঈদের মধ্যে আইসি তোমাক দেখপো। কিন্তুক ছাওয়ালের মুক আমার আর দেকা হইল না। বন্ধুর ডাকে পঞ্চগড়ে জলসা শুনতে গেল, এখন শুনি আমার ছাওয়াল আর নাই। আমার ছাওয়ালের কোনো রিপোর্ট নাই। এত ভালো ছাওয়ালেক কবরে থুইয়ে আমি কি কইরি থাইকপো।’ পঞ্চগড়ে আহমদিয়া জামাতের সালানা জলসাকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে নিহত নাটোরের বড়াইগ্রামের নটাবাড়িয়া গ্রামের প্রকৌশলী জাহিদ হাসানের মা জরিনা বেগম এভাবেই বিলাপ করেন। একমাত্র ছেলেকে হারানো মায়ের এমন আহাজারিতে এলাকাজুড়ে শোকের ছায়া নেমে আসে।

চাচাতো ভাই বনপাড়া বিসমিল্লাহ ডায়াগনস্টিক সেন্টারের এমডি রেজাউল করিম জানান, নাটোর সরকারি টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে এসএসসি ও ডিপ্লোমা পাশ করেন জাহিদ। এরপর বগুড়া পুন্ড্র ইউনিভার্সিটি অফ সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি থেকে বিএসসি ইন ডিপার্টমেন্ট অফ ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (ইইই) ডিগ্রি নেন। প্রায় বছরখানেক আগে ঢাকার বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বায়োটেক ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডে তিনি চাকরি নেন। তার উপার্জনেই সংসার চলত। চাকরির পাশাপাশি স্কলারশিপ নিয়ে জাহিদ উচ্চ শিক্ষার জন্য বিদেশে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন বলেও তিনি জানান। জাহিদের বড় বোন শাকিলা খাতুন জানান, বৃহস্পতিবার বিকালে ঢাকা থেকে পঞ্চগড়ের এক বন্ধুর আমন্ত্রণে সেখানে জলসায় যোগ দিতে যায়। আর বাড়ি থেকে আমার বাবা ও চাচাও সেখানে যান। শুক্রবার রাত ১১টার দিকে মোবাইল ফোনে আমার ভাইকে হত্যার খবর পাই। অপর বোন লিপি খাতুন জানান, বছর খানেক আগে চাকরি পেয়েছে জাহিদ। তার আয়েই বাবা-মার সংসার চলত। তাকে নিয়ে কত স্বপ্ন ছিল পরিবারের। কিন্তু নিমিষেই সব শেষ হয়ে গেল।

মাঝগাঁও ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল আজাদ দুলাল জানান, আমাদের এলাকায় কোনো কাদিয়ানি নেই। তবে আরিফ লেখাপড়া করতে গিয়ে সম্পৃক্ত হয়েছে কিনা জানি না। জাহিদের স্বজনদের দাবি, জাহিদ বা তারা কেউই আহমদিয়া সম্প্রদায়ভুক্ত নয়। এক বন্ধুর দাওয়াতে জাহিদ, তার বাবা আবু বকর সিদ্দিক ও চাচা মহসিন আলী সেখানে যান। ফুফাতো ভাই শান্ত জানান, জাহিদ ওই সম্প্রদায়ে যোগ দিয়েছে বলে কখনও শুনিনি। তারা আমাদের মতোই মুসলিম। তবে স্থানীয়রা জানান, তারা আগে গ্রামের মসজিদে নামাজ পড়লেও দীর্ঘদিন ধরে আসেন না। স্থানীয় মসজিদের ইমাম হোসাইন আহমেদ জানান, ওয়াক্তিয়া নামাজে তারা আসেন না। আর জুমার নামাজ উপজেলার মৌখাড়ার এক মসজিদে গিয়ে পড়েন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *