দিশেহারা হাওড়ের কৃষক

উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে ব্রাহ্মণবাড়িয়া নাসিরনগর উপজেলার মেদির হাওড়, আকাশী হাওড় বালিয়া বিল আটাউল বিস্তীর্ণ ফসলি জমির মাঠ পানির নিচে তলিয়ে গেছে। এতে কয়েক হাজার কৃষক পরিবার ফসল হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছে। উপজেলা প্রশাসন এবং কৃষি বিভাগ বলছে, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের বিশেষ প্রণোদনার আওতায় আনতে তালিকা প্রণয়ন করা হচ্ছে।

হাওড়ের ক্ষতিগ্রস্ত, নাসিরনগর সদর উপজেলার কামার কামারগাঁও এলাকার বাসিন্দা বিজয় ঋষি জানান, তিনি রাজধানীর মতিঝিল এলাকায় জুতা সেলাইয়ের কাজ করতেন। অভাব-অনটনে পরিবার নিয়ে চলছিলেন অনেকটাই কষ্টের মধ্যে। পরিবারে একটু স্বাচ্ছন্দ্যে চলার আশায় এবছর অন্যের কাছ থেকে ১৫ কানি জমি বর্গা নিয়ে বোরো এবং বিআর-২৮ ধানের আবাদ করেছিলেন। কিন্তু বিধিবাম উজান থেকে নেমে আসা আগাম বানের পানিতে তলিয়ে গেছে তার স্বপ্নের সোনালী ফসল। আধা পাকা ধান পানির নিচে দেখে অনেকটাই নির্বাক হয়ে পড়েছেন তিনি।’


বৃহস্পতিবার (২১ এপ্রিল) দুপুরে মেদির হাওড়ে আধাপাকা ধান কাটার সময় এ প্রতিবেদকের সাথে কথা বলার সময় বাকরুদ্ধ কৃষক বিজয় ঋষি হঠাৎ কেঁদে ওঠেন। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘১৫ হাজার টাকা দিয়ে গ্রামের খোকা ঋষি এবং সন্ন্যাসী ঋষির কাছ থেকে ১৫ কানি জমি বর্গা নিয়েছিলেন এবছর। বছরে একটি মাত্র ভালো ফসল পাওয়ার আশায়। ফসল পেলে কিছু বিক্রি করে ধারদেনা, ঋণ পরিশোধ করবেন। কিছু ধান চাল করে নিজের খাবারের জন্যে রাখবেন। সব আশা ভরসা এখন ফিকে হয়ে আসছে।’
তিনি আক্ষেপ করে জানান, বেঁচে থাকার জন্যে একমাত্র অবলম্বন ছিল এই ধানের জমি। স্বপ্নের সোনালী ফসল এভাবে চোখের সামনে পানির নিচে চলে যাবে কখনো ভাবতে পারেননি। এমন দুঃসময়ে সরকারের কৃষিবিভাগ বা উপজেলা প্রশাসনের কেউ এখন পর্যন্ত খবর নেননি। কী করবেন এখন চোখে পথ দেখছিলেন না। তিনি বলেন, ‘আবারো জুতা সেলাইয়ের কাজে ফিরতে হবে। গুনতে হবে ঋণের বোঝা।’ এমন দুশ্চিন্তায় চোখে মুখে দুঃস্বপ্নের ছাপ ভেসে উঠছিল বিজয় ঋষির।

একই কথা বলছিলেন হাওড় পাড়ের অপর বাসিন্দা নাসিরনগর পশ্চিমপাড়ার বাসিন্দা রূপন দাস। তিনি বলেন, ‘অন্যের  বাড়িতে স্যাঁতসেঁতে জমিতে মাটি ভাড়া নিয়ে ঘর তুলে বসবাস করছি। হাওড়ে আমার ৮ কানি জমি আছে। এ বছর ইরি, বোরো ধান লাগাইছিলাম। ধানও আইছিল ভালো। কিন্তু আগাম বানের পানি সব তলাইয়া নিয়া গেছে। এক মুঠো ধান হাওড় থেকে বাড়িতে আনতে পারিনি। শুষ্ক মৌসুমে এ ধানের জমি ছিল একমাত্র অবলম্বন। আর বর্ষা মৌসুমের মাছ বিক্রি করে চলত আমার পরিবারের জীবনযাত্রা। কিন্তু এবছর ফসল হারিয়ে আমি নিঃস্ব।’

তিনি বলেন, ‘পরিবার নিয়ে এখন বিপাকে পড়েছি। এর মধ্যে একমাত্র ছেলে এ বছর জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় লোকপ্রশাসন বিভাগে চান্স পেয়ে ভর্তি হয়েছে। জাল দিয়ে মাছ মেরে আর কৃষিকাজ করে চলে আমার পরিবারের জীবন। এমন অবস্থায় ছেলেকে কীভাবে লেখাপড়া করাবো এই নিয়ে দুশ্চিন্তা আরও বেড়ে গেছে। এমনিতেই পুরো বছর চলে অভাব অনটনে। এ বছর পরিবার নিয়ে বাঁচতে গেলে আবারও দাদন ব্যবসায়ী ও এনজিওর দ্বারস্থ হতে হবে’।

শুধু কৃষক বিজয় ঋষি ও রূপন দাসই নয় এমন চিত্র মেদির হাওড়, আকাশি হাওড়, আটাউরি বিল, বালিয়া বিলসহ পুরো এলাকার ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের। তারা সরকারি কোনো ধরনের সহায়তা না পেয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
হাওড় পাড়ের কৃষক জিলু চৌধুরী বলছিলেন, ‘তার পরিবারের ৭০ কানি ধানি ফসলি জমি এখন পানির নিচে। এখন পর্যন্ত কোনো সরকারি দফতরের কেউ আমার সাথে যোগাযোগ করেননি। আমি শুনেছি কারা কারা নাকি তালিকা প্রণয়ন করছেন, তবে এখন কেউ আমার সাথে যোগাযোগ করেনি।’

নাসিরনগর সদরের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের মেম্বার আজদু মিয়া বলেন, আমার জমিও পানির তলে। আমার এলাকার অনেকের জমির ওপর দিয়ে এখন নৌকা যায়। অনেক কৃষক একমাত্র ফসল ধান হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন। কেউ এখনো ক্ষতিগ্রস্ত তালিকা প্রণয়ন করার জন্য আমাকে জানায়নি। বা এমন কোনো নির্দেশনাও আসেনি।
তবে উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা মো. আবু সাইদ তারেক জানান, তারা ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের তালিকা প্রণয়ন করছে। ইতো মধ্যে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার চেয়ারম্যানদের মাধ্যমে দুই হাজার ৫০ জনের তালিকা প্রণয়ন করা হয়েছে। প্রয়োজনে এই তালিকা আরও সম্প্রসারণ করা হবে বলে জানান।

এদিকে ভারপ্রাপ্ত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মেহেদী হাসান শাওন জানান, হাওড় পাড়ে মাইকিং করে কৃষককে ৮০ ভাগ পরিপক্ব ধান কেটে আনার জন্য বলা হয়েছে। কৃষি বিভাগের সহায়তায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সরকারি প্রণোদনার আওতায় নিয়ে আসা হবে।
এদিকে হাওড় অঞ্চলের কৃষকদের তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত অন্তত এক হাজার হেক্টর ফসলি জমি পানির নিচে তলিয়ে গেছে। তবে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর বলছে, সব মিলিয়ে এখন পর্যন্ত  মাত্র ৩৫০ হেক্টর জমি পানির নিচে তলিয়ে গেছে। গত দুই দিনের ব্যবধানে ঝড়-বৃষ্টিতে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরও বেড়েছে বলে দাবি করেছেন কৃষকরা।

Related Posts