ছাত্রনেতাদের বাজেট নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া

ছাত্রনেতাদের বাজেট নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া

জাতীয় সংসদে গত ৭ জুন নতুন অর্থবছরের (২০২৪-২৫) প্রস্তাবিত বাজেট উপস্থাপন করেছেন অর্থমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী। এদিন বিকালে প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে ৭ লাখ ৯৭ হাজার কোটি টাকার প্রস্তাবিত বাজেট পেশ করেন তিনি। প্রস্তাবিত এই বাজেট নিয়ে বিভিন্ন মহলে এখন চলছে আলোচনা-সমালোচনা। বাজেট নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, ব্যবসায়ী সমাজসহ পেশাজীবী সংগঠনগুলো। ব্যতিক্রম নয় ছাত্রসংগঠনগুলোও। ছাত্রনেতাদের মধ্যে কেউ বাজেটকে শিক্ষাবান্ধব স্বপ্নের বাজেট বলে আখ্যায়িত করেছেন। কেউ বা বলেছেন, এই বাজেট প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। আবার অনেকে নতুন বাজেট শিক্ষাবান্ধব হয়নি বলেও মন্তব্য করেছেন।

অনেক ছাত্রনেতা মনে করেন, এই বাজেট সিন্ডিকেট ও ব্যবসায়ীবান্ধব। গুটিকয়েক লোকের স্বার্থে এই বাজেট করা হয়েছে। দেশের বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে বাজেট নিয়ে আলাপ হয় বাংলা ট্রিবিউনের। এসব সংগঠনের মধ্যে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল, বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্র মৈত্রী, সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট, ছাত্র অধিকার পরিষদ ও বাংলাদেশ ছাত্রলীগ উল্লেখযোগ্য।

শিক্ষা খাতে আমাদের যে চাওয়া, সেটার সঠিক বরাদ্দ আমরা পাইনি বলে মন্তব্য করেছেন বামপন্থি ছাত্রসংগঠন বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের (একাংশ) নবনির্বাচিত সভাপতি মাহির শাহরিয়ার রেজা। বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, এই বাজেট আসলে কোনোভাবেই শিক্ষাবান্ধব না। সরকার যে নতুন শিক্ষানীতি প্রণয়নের চেষ্টা করছে, সেটা এই বাজেটে বাস্তবায়ন হবে কিনা, তা নিয়ে আমরা সন্দিহান। তাছাড়া সরকার জিডিপির ৬ শতাংশ শিক্ষা খাতে বরাদ্দের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, কিন্তু তারা সেই প্রতিশ্রুতি রাখেনি। আমরা বাজেট নিয়ে এখনও পূর্ণাঙ্গ বিশ্লেষণ করতে পারিনি। খুব দ্রুতই বাজেট নিয়ে আমরা একটা পূর্ণাঙ্গ বিশ্লেষণ প্রকাশ করবো।

ছাত্র অধিকার পরিষদের কেন্দ্রীয় সভাপতি বিন ইয়ামিন মোল্লা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, যারা প্রভাবশালী তারা তাদের স্বার্থ হাসিল করার জন্য এই বাজেট করেছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে সামনে রেখে আসলে এই বাজেট প্রণয়ন করা হয়নি। শিক্ষায় কীভাবে কোন খাতে খরচ হবে বা গত বছরের বাজেটে কী খরচ হয়েছে, কতটুকু প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন হয়েছে, নতুন অর্থবছরের বাজেটে তা উল্লেখ নেই। এটা একটা গতানুগতিক ধারায় বাজেট।

গবেষণা খাতে বরাদ্দ কম উল্লেখ করে বিন ইয়ামিন মোল্লা বলেন, বাজেট আদৌ শিক্ষার এবং শিক্ষার্থীদের কাজে লাগে কিনা, তা যাচাই করতে হবে। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণা খাতে বরাদ্দ খুবই কম। একটা দেশে যদি গবেষণা খাতের ব্যাপক বিস্তৃতি না থাকে, তাহলে সেই দেশের উন্নয়ন হবে না। এবারের বাজেটে দেখবেন, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য বরাদ্দ মাত্র এক লাখ টাকা। রংপুর মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় প্রস্তাবনায় থাকলেও তার জন্য কোনও বরাদ্দ নেই। বাজেটে শিক্ষা ও গবেষণায় বরাদ্দ বাড়াতে হবে।

নতুন বাজেটকে সিন্ডিকেট ও ব্যবসায়ীবান্ধব আখ্যা দিয়ে সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের সভাপতি মুক্তা বাড়ৈ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, এই বাজেট শিক্ষা বা শিক্ষার্থীবান্ধব না। এটা হচ্ছে সিন্ডিকেট ও ব্যবসায়ীবান্ধব বাজেট। এটা মানুষবান্ধব বাজেট না। গত বছরও শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাত অবহেলিত ছিল। এবারও তার ব্যতিক্রম নয়। ইউনেস্কোর জাতীয় বাজেটে শিক্ষা খাত নিয়ে যে দাবি ছিল, ছাত্র সংগঠনগুলোও সেই একই দাবি করে আসছে। এই সরকার শুধু মুখেই বলে শিক্ষা ও শিক্ষার্থীবান্ধব সরকার।

২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেট প্রত্যাখ্যান করে মুক্তা বাড়ৈ বলেন, এই বাজেট লুটেরাদের স্বার্থে এবং যারা সিন্ডিকেটের হোতা, তাদের পকেট ভারী করতে করা হয়েছে। আমরা দেখছি, ক্রমান্বয়ে শিক্ষা খাতে বাজেট কমছে। এবারও শিক্ষায় বরাদ্দ ১১ দশমিক ৮৮ শতাংশ, যা খুবই কম। বলা হয় যে দক্ষিণ এশিয়ায় শিক্ষা খাতে সর্বনিম্ন অবস্থান হচ্ছে বাংলাদেশের। তিনি বলেন,  এটা একটা গণবিরোধী বাজেট। আমরা এই বাজেটকে প্রত্যাখ্যান করছি। একইসঙ্গে সরকারকে নতুন করে গণমুখী বাজেট দেওয়ার আহ্বান করছি।

বাংলাদেশ ছাত্রমৈত্রীর সভাপতি অতুল দাস বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, বাজেট নিয়ে আমরা খুব বেশি আশান্বিত না। আমরা মনে করি, জাতীয় বাজেটের অন্তত ২৫ শতাংশ শিক্ষায় থাকা উচিত বা জাতীয় আয়ের ৮ শতাংশ। পৃথিবীর অনেক অনুন্নত দেশের চেয়েও বাংলাদেশে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ কম। কালো টাকা সাদা করার যে সুযোগ, সেটা আমরা আগেও দেখেছি। এটি বরং যারা দুর্নীতিগ্রস্ত, তাদের সেই আয়কে উৎসাহিত করে।

বাম সংগঠনটির এই ছাত্রনেতা আরও বলেন, বাজেট ঘোষণার আগে আমরা একটা সেমিনার করে কিছু দাবি-দাওয়া তুলে ধরেছিলাম। শিক্ষা খাতে কী ধরনের বাজেট হওয়া উচিত, বাজেটে সেটা কীভাবে বরাদ্দ হলে শিক্ষার উন্নতি ঘটবে, আমরা তা তুলে ধরেছি। কিন্তু সেসব দাবির কোনও কিছুই এই বাজেটে প্রতিফলন ঘটেনি।

২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেটকে পুরোপুরি ব্যবসাবান্ধব বাজেট বলে আখ্যায়িত করেছেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল কেন্দ্রীয় নির্বাহী সংসদের সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব। বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, এই অবৈধ সরকারের বাজেট নিয়ে আমাদের কোনও আগ্রহ নেই। তবু ছাত্র সংগঠনের একজন নেতা হিসেবে আমি যেটা লক্ষ করেছি, সেটা হচ্ছে এই বাজেটে শিক্ষা খাতকে অবজ্ঞা করা হয়েছে। আমাদের দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা আধুনিক বিশ্বের থেকে অনেক পিছিয়ে আছে। বুয়েট ব্যতীত সারা দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে অনেক পিছিয়ে।

এই অবৈধ সরকার শিক্ষা খাতকে ধ্বংসের পাঁয়তারা করছে উল্লেখ করে ছাত্রদল সভাপতি বলেন, শিক্ষা খাত নিয়ে কোনও যুগান্তকারী পদক্ষেপ নেই। কোনও সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা নেই। এদের অন্য কোনও উদ্দেশ্য জড়িত আছে। কীভাবে শিক্ষা খাতের এই বাজেট বাস্তবায়ন হবে, তা বিস্তারিত উল্লেখ নেই। পুরো বাজেট নিয়ে কোনও সুষ্ঠু পরিকল্পনা নেই। কীভাবে থাকবে, এরা তো জনগণের ভোটে নির্বাচিত নয়। যার জন্য শিক্ষার মানোন্নয়ন বা জনগণের জীবনযাত্রার উন্নয়ন এদের কাছে মুখ্য বিষয় নয়।

এদিকে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেটকে সুখী, সমৃদ্ধ, উন্নত ও স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণের বাজেট বলে স্বাগত জানিয়ে আনন্দ মিছিল করেছে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ। নতুন অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটকে ‘তারুণ্যের স্বপ্ন পূরণের’ বাজেট বলে আখ্যায়িত করেছেন বাংলাদেশ ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় সংসদের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন। বাজেট ঘোষণার পরপরই আনন্দ মিছিল করে গণমাধ্যমকে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবার ৭ লাখ ৯৭ হাজার কোটি টাকার বাজেট দিয়েছেন। এই বাজেট তারুণ্যের স্বপ্ন পূরণের বাজেট। এটি বেকারত্ব দূরীকরণের উপযোগী।

সাদ্দাম হোসেন আরও বলেন, শেখ হাসিনা সরকার যে বাজেট উপস্থাপন করেছে, এটা বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করার উপযোগী। বর্তমানে পৃথিবীর অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণ করতে হিমশিম খাচ্ছেন বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রনায়কেরা। আমরা মনে করি, পৃথিবীব্যাপী কৃচ্ছ্রসাধন থেকে বাইরে এসে জনগণের জীবনমান উন্নয়নের উপযোগী হচ্ছে নতুন অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট। অর্থনীতির সব সূচকে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখার একটি রূপরেখা দেওয়া হয়েছে এবারের বাজেট। এই বাজেট গরিব মেহনতি মানুষের ওপর ট্যাক্সের চাপ কমানোর বাজেট।