আশ্বাস নেই ঋণের, তবে দক্ষিণবঙ্গের উন্নয়নে সমর্থন দিয়েছে চীন

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেইজিং সফরে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে দুটি বড় চাওয়া ছিল। এর মধ্যে একটি হচ্ছে ৫০০ কোটি ডলার ঋণ সহায়তা এবং দ্বিতীয়টি সাউদার্ন ইন্টিগ্রেটেড ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ (সিডি) বা পায়রা বন্দরকে কেন্দ্র করে দক্ষিণাঞ্চলের উন্নয়নে চীনের সম্পৃক্ততা। এরমধ্যে সিডিতে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার প্রতিশ্রুতি দিলেও ৫০০ কোটি ডলারের বিষয়ে চীন কোনও প্রতিশ্রুতি দেয়নি।

৮ থেকে ১০ জুলাই প্রধানমস্ত্রীর চীন সফরের পরে ঘোষিত ২৭ দফা যৌথ বিবৃতিতে সফরের ফলাফল বিবৃত করা হয়। সেখানে সিডি বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু ঋণ সহায়তার বিষয়টি বলা হয়নি। এমনকি বাংলাদেশকে চীন যে ১৬০০ কোটি টাকা সহায়তা দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে সেটার কথাও উল্লেখ করা হয়নি।

সফরে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং, প্রধানমন্ত্রী লি শিয়াংসহ অন্যান্য জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন শেখ হাসিনা। এছাড়া ২১টি সমঝোতা স্মারক, সাতটি ঘোষণা এবং ১৬টি ব্যবসায়িক সমঝোতা হয়েছে।

সরকারের সঙ্গে সমঝোতা স্মারকের খাতগুলো হচ্ছে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, ডিজিটাল অর্থনীতি, আর্থিক খাতে সহায়তা, শিক্ষা সহযোগিতা, স্বাস্থ্য সেবা ও জনস্বাস্থ্য, অবকাঠামো সহযোগিতা, জলবায়ু পরিবর্তন উন্নয়ন, কৃষি সহযোগিতা, হাইড্রোলজিক্যাল পূর্বাভাস এবং রেডিও ও টেলিভিশন সহযোগিতা।

দক্ষিণবঙ্গের উন্নয়ন

সাউদার্ন ইন্টিগ্রেটেড ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভের যে বাংলাদেশি পরিকল্পনা সেটিকে সমর্থন করে চীন। যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগের অধীনে এই অঞ্চলের ভারসাম্য এবং টেকসই উন্নয়নের জন্য চীন সিডিকে সমর্থন করে।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (বিআরআই) অধীনে আরও গুণগত মানসম্পন্ন প্রকল্প গ্রহণ করা হবে যেখানে দুই পক্ষ একসঙ্গে পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন করবে এবং উভয়পক্ষই এর মাধ্যমে লাভবান হবে।

তাইওয়ান

গত ১০ বছরে চীন ও বাংলাদেশ দুই পক্ষের মধ্যে তিনটি শীর্ষ সফর হয়েছে। এর মধ্যে ২০১৪ ও ২০১৯ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চীন সফর করেছেন। অন্যদিকে ২০১৬ সালে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ঢাকা সফর করেছেন। তিনটি ক্ষেত্রেই যৌথ বিবৃতিতে ‘ওয়ান চায়না পলিসি’ বাংলাদেশ সমর্থন করে সেটি উল্লেখ করা ছিল।

এবারের সফরের যৌথ বিবৃতিতে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ১৯৭১ সালের ২৫ অক্টোবর গৃহীত ২৭৫৮ রেজুলেশনকে উল্লেখ করে ‘তাইওয়ানও’ চীনের অংশ – সেটি উল্লেখ করা হয়েছে।

নতুন উচ্চতায় সম্পর্ক

২০১৬ সালে দুই পক্ষের সঙ্গে সম্পর্ক ‘কৌশলগত অংশীদারত্ব’ স্তরে নেওয়া হয়। যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, এই সম্পর্ককে ‘সর্বাঙ্গীন কৌশলগত সহযোগী অংশীদারিত্ব’ স্তরে নেওয়ার বিষয়ে উভয়পক্ষ সম্মত হয়েছে।

আগামী বছর দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্কের ৫০ বছর পূর্তি হবে। এই উপলক্ষে ভবিষ্যৎ দ্বিপক্ষীয় উন্নয়নে দুই দেশ একসঙ্গে কাজ করবে।

নতুন প্রকল্প

চীনের সহযোগিতায় বাংলাদেশে পদ্মা সেতু, কর্ণফুলি টানেল, সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিংসহ বিভিন্ন প্রকল্প সম্পন্ন হয়েছে। এছাড়া পদ্মা সেতু রেল লিংক, ঢাকা-আশুলিয়া এলেভেটেডে এক্সপ্রেসওয়ে, রাজশাহী পানি শোধনাগারসহ বিভিন্ন প্রকল্প চলমান রয়েছে।

যৌথ বিবৃতিতে নতুন প্রকল্পের মধ্যে সাবওয়ে, মেট্রোরেল ও সড়ক; তেল ও গ্যাস অনুসন্ধান; হাসপাতাল এবং পানি সম্পদ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্রকল্পের বিষয়ে চীনের এন্টারপ্রাইজগুলোকে উৎসাহিত করা হয়েছে।

প্রসঙ্গত, প্রধানমন্ত্রীর সফরে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে যেসব দলিল স্বাক্ষরিত হয়েছে তার মধ্যে রয়েছে-

১. ডিজিটাল অর্থনীতিতে বিনিয়োগ সহযোগিতা জোরদার করার বিষয়ে সমঝোতা স্মারক সই।

২. চায়না ন্যাশনাল ফাইন্যান্সিয়াল রেগুলেটরি অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এনএফআরএ) এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের মধ্যে ব্যাংকিং এবং বীমা নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত সমঝোতা স্মারক সই।

৩. বাংলাদেশ থেকে চীনে তাজা আম রফতানির জন্য উদ্ভিদ স্বাস্থ্য সম্পর্কিত (ফাইটোস্যানিটারি)  উপকরণ বিষয়ে একটি প্রটোকল সই করে দুই দেশ।

৪. অর্থনৈতিক উন্নয়ন নীতি সহায়তা ক্ষেত্রে একটি সমঝোতা স্মারক সই করে দুই দেশ।

৫. বাণিজ্য এবং বিনিয়োগ সহায়তা বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারক সই হয়।

৬. বাংলাদেশে প্রকল্পে চায়না-এইড ন্যাশনাল ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টারের ‘সম্ভ্যাবতা সমীক্ষা’ বিষয়ে আলোচনার একটি সাইনিং অব মিনিটস (কার্যবিবরণী) সই হয়।

৭. চীনের সহায়তায় ষষ্ঠ বাংলাদেশ-চায়না মৈত্রী সেতু সংস্কার প্রকল্পের চিঠি বিনিময় হয়।

৮. নাটেশ্বর প্রত্নতাত্বিক স্থাপনা পার্ক প্রকল্পে চায়না-এইড কনস্ট্রাকশনের সম্ভ্যাবতা সমীক্ষা বিষয়ে চিঠি বিনিময় হয়।

৯. চীনের সহায়তায় নবম বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সেতু প্রকল্প বিষয়ে চিঠি বিনিময় হয়।

১০. মেডিক্যাল সেবা এবং জনস্বাস্থ্য বিষয়ে সহযোগিতা শক্তিশালী করতে একটি সমঝোতা স্মারক সই হয়।

১১. অবকাঠামোগত সহযোগিতা জোরদারে একটি সমঝোতা স্মারক সই হয়।

১২. গ্রিন অ্যান্ড লো-কার্বন উন্নয়ন বিষয়ে সহযোগিতা বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারক সই করে দুই দেশ।

১৩. বন্যার মৌসুমে ইয়ালুজাংবু (ব্রহ্মপুত্র) নদীর হাইড্রোলজিক্যাল তথ্য বাংলাদেশ দেওয়ার বিধি বিষয়ক সমঝোতা স্মারক নবায়ন করা হয়।

১৪. চীনের জাতীয় বেতার ও টেলিভিশন প্রশাসন এবং বাংলাদেশের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর সই হয়।

১৫. চায়না মিডিয়া গ্রুপ (সিএমজি) ও বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) মধ্যে পারষ্পরিক সমঝোতা বিষয়ক সমঝোতা স্মারক সই হয়। বাসসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান সম্পাদক আবুল কালাম আজাদ এতে সই করেন।

১৬. চায়না মিডিয়া গ্রুপ (সিএমজি) এবং বিটিভি’র মধ্যে সমঝোতা স্মারক সই হয়।

১৭. সিনহুয়া নিউজ এজেন্সি ও বিটিভি’র মধ্যে সমঝোতা স্মারক সই।

১৮. চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা সিনহুয়া এবং বাংলদেশের জাতীয় সংবাদ সংস্থা বাসস’র মধ্যেও একটি স্মারক সই হয়।

১৯. আরেকটি দলিল সই করে সিনহুয়া সংবাদ সংস্থা ও বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি)।

২০. একটি সমঝাতা স্মারক নবায়ন করে চীনের শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশের শিক্ষা মন্ত্রণালয়।

২১. টেকসই অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারক সই হয়।

৭টি ঘোষণাপত্রের মধ্যে রয়েছে-

১.  চীন-বাংলাদেশ মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি বিষয়ে যৌথ সম্ভ্যাবতা সমীক্ষা সমাপ্তি ঘোষণা।

২.  চীন-বাংলাদেশ দ্বিপাক্ষিক বিনিয়োগ চুক্তি ত্বরান্বিতকরণ নিয়ে আলোচনা শুরুর ঘোষণা।

৩.  ডিজিটাল কানেক্টিভিটি প্রকল্পের জন্য টেলিকমিউনিকেশন নেটওয়ার্কের আধুনিকীকরণের সমাপ্তির ঘোষণা।

৪.  ডাবল পাইপ লাইন প্রকল্পের সঙ্গে সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং এর ট্রায়াল রান সমাপ্তির ঘোষণা।

৫.  রাজশাহী ওয়াসা সারফেস ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট চালুর ঘোষণা।

৬. শানদং কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় গাজীপুরের মধ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর।

৭.  বাংলাদেশে লুবান ওয়ার্কশপ নির্মাণের ঘোষণা।